কুলি মজুর কবিতা: মূল বক্তব্য, শব্দার্থ ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

কুলি মজুর কবিতার মূল বক্তব্য

মূলভাবঃ ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম শ্রমজীবী মানুষের শোষণ ও অবহেলার বেদনাদায়ক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি সেদিন রেলস্টেশনে দেখলেন, এক বাবু কুলিকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছে, আর তাতে তাঁর চোখ দিয়ে পানি এসে গেল। তিনি মনে করেন, দধীচি মুনির হাড় দিয়ে যেমন রথ চলে, তেমনি কুলি-মজুরদের শ্রমেই বাষ্পচালিত শকট, জাহাজ, মোটর ও কলকারখানা চলছে। কিন্তু ধনীরা আরামে এসব ব্যবহার করে, আর কুলি-মজুররা অবহেলিত থাকে। ধনীরা কুলিদের সামান্য বেতন দিয়ে নিজেরা কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে, অট্টালিকা গড়ে তোলে। পথের প্রতিটি ধূলিকণা জানে, কুলি-মজুরদের পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এই সভ্যতা। যারা হাতুড়ি-শাবল দিয়ে পাহাড় ভেঙে পথ বানিয়েছে, তাদের হাড় পথের ধারে পড়ে আছে। কবি বিশ্বাস করেন, শুভদিন আসছে, যেদিন শোষিতদের পাওনা ফিরিয়ে দিতে হবে। শ্রমজীবী মানুষই আসল মানুষ ও দেবতা, আর তাদের ব্যথিত বুকে পা রেখেই পৃথিবীতে নতুন উত্থান আসে। তাই কবি সেই কুলি-মজুরদের গান গাইতে চান।

কুলি মজুর কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

দধীচি → এক ঋষি যিনি নিজের হাড় দান করেছিলেন

বাষ্প-শকট → বাষ্পে চালিত গাড়ি (এখানে রেলগাড়ি)

বাবু সাব → বাবু ও সাহেব / উচ্চশ্রেণির ধনী লোক

ঠেলে দিলে নিচে ফেলে → ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দিল

জগৎ জুড়িয়া → সারা পৃথিবী জুড়ে

বেতন দিয়াছ? → তুমি কি মজুরি দিয়েছ?

মিথ্যাবাদীর দল → মিথ্যুকদের দল

পাই → পুরনো মুদ্রার একক / এখানে অতি সামান্য মজুরি

ক্রোর → কোটি / কোটিপতি

মোটর → গাড়ি

ছেয়ে গেল কলে → কলকারখানায় ভরে গেছে

অট্টালিকা → উঁচু দালান / প্রাসাদ

ঠুলি খুলে → চোখের ওপরের ঢাকনি সরিয়ে / সচেতন হয়ে

পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি → নিজের পবিত্র শরীরে ধুলো মেখে

ব্যথিত বক্ষে → বেদনায় ভরা বুকে

নব উত্থান → নতুন করে জেগে ওঠা / নতুন উন্নতি

রূপকার → নির্মাতা / গঠনকারী

অক্লান্ত শ্রম → ক্লান্তিহীন পরিশ্রম

শোষণ → নিংড়ে নেওয়া / অন্যায়ভাবে শ্রমের মূল্য না দেওয়া

ধনিকশ্রেণি → ধনী শ্রেণি

বিত্ত-সম্পদ → ধন-সম্পদ

বঞ্চিত → সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত

উপেক্ষিত → অবহেলিত / গুরুত্ব না পাওয়া

স্বার্থান্ধ → নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখে না এমন

গণ্য করতেও নারাজ → মানুষ হিসেবে মানতেও চায় না

কুলি মজুর কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

কবিতা থেকে জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ১: ‘কুলি-মজুর’ কবিতার কবি কে?
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম।

প্রশ্ন ২: সেদিন রেলস্টেশনে কী ঘটেছিল?
উত্তর: এক বাবু কুলিকে ঠেলে নিচে ফেলে দিল।

প্রশ্ন ৩: ঘটনাটি দেখে কবির কী হলো?
উত্তর: চোখ ফেটে জল এল।

প্রশ্ন ৪: কাদের হাড় দিয়ে বাষ্প-শকট চলে?
উত্তর: দধীচিদের হাড় দিয়ে।

প্রশ্ন ৫: বাবু-সাহেবেরা কোথায় চড়ল এবং কুলিরা কোথায় পড়ল?
উত্তর: বাবু-সাহেবেরা উপরে চড়ল, কুলিরা নিচে পড়ল।

প্রশ্ন ৬: ধনীরা কী দিয়েছে বলে কবি প্রশ্ন করেছেন?
উত্তর: বেতন দিয়েছে কি না?

প্রশ্ন ৭: মিথ্যাবাদীদের কী করতে বলা হয়েছে?
উত্তর: চুপ করতে বলা হয়েছে।

প্রশ্ন ৮: ধনীরা কুলিদের কী দিয়ে কত ক্রোর পেল?
উত্তর: পাই দিয়ে ক্রোর পেল।

প্রশ্ন ৯: ‘পাই’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: সামান্য মজুরি।

প্রশ্ন ১০: রাজপথে কী চলছে?
উত্তর: মোটর চলছে।

প্রশ্ন ১১: সাগরে কী চলছে?
উত্তর: জাহাজ চলছে।

প্রশ্ন ১২: দেশ কী দিয়ে ছেয়ে গেছে?
উত্তর: কলে (কলকারখানায়)।

প্রশ্ন ১৩: ধনীর অট্টালিকা কার খুনে রাঙা বলে কবি প্রশ্ন করেছেন?
উত্তর: কুলি-মজুরদের খুনে রাঙা।

প্রশ্ন ১৪: পথের প্রতি ধূলিকণা কী জানে?
উত্তর: পথ, জাহাজ, শকট, অট্টালিকার অর্থ জানে।

প্রশ্ন ১৫: ‘আসিতেছে শুভদিন’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: শোষিত মানুষের মুক্তির দিন আসছে।

প্রশ্ন ১৬: ‘দেনা’ ও ‘ঋণ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কুলি-মজুরদের পাওনা।

প্রশ্ন ১৭: যারা পাহাড় ভাঙিয়েছে, তাদের হাড় কোথায় পড়ে আছে?
উত্তর: পাহাড়-কাটা পথের দুপাশে।

প্রশ্ন ১৮: যারা ধুলি লাগিয়েছে, তারা কারা?
উত্তর: মজুর, মুটে ও কুলি।

প্রশ্ন ১৯: কবি কাদের গান গাইতে চান?
উত্তর: কুলি-মজুরদের গান।

প্রশ্ন ২০: ‘নব উত্থান’ আসে কার বক্ষে পা রেখে?
উত্তর: শোষিত মানুষের ব্যথিত বক্ষে পা রেখে।

শব্দার্থ ও পাঠ পরিচিতি থেকে জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ২১: ‘দধীচি’ কে ছিলেন?
উত্তর: ভারতীয় পুরাণের একজন ত্যাগী মুনি।

প্রশ্ন ২২: ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় দধীচির সঙ্গে কাদের তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: শ্রমজীবী কুলি-মজুরদের।

প্রশ্ন ২৩: ‘বাষ্প-শকট’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বাষ্পচালিত গাড়ি (এখানে রেলগাড়ি)।

প্রশ্ন ২৪: ‘পাই’ শব্দটি এ কবিতায় কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?
উত্তর: কুলি-মজুরদের মজুরির স্বল্পতা বোঝাতে।

প্রশ্ন ২৫: ‘ক্রোর’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: কোটি।

প্রশ্ন ২৬: ‘ঠুলি’ কী?
উত্তর: গরুর চোখের ওপর পরানো ঢাকনি।

প্রশ্ন ২৭: ‘ঠুলি খুলে দেখ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: সচেতন হয়ে দেখ।

প্রশ্ন ২৮: ‘অট্টালিকা’ ও ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: অট্টালিকা অর্থ প্রাসাদ ও দেনা অর্থ শ্রমজীবীদের পাওনা।

প্রশ্ন ২৯: ‘শাবল’ ও ‘গাঁইতি’ কী?
উত্তর: শাবল অর্থ মাটি খোঁড়ার হাতিয়ার ও গাঁইতি অর্থ পাথর খোঁড়ার দুমুখো কুড়াল।

প্রশ্ন ৩০: ‘বক্ষে’ ও ‘নব উত্থান’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: বক্ষে অর্থ বুকে ও নব উত্থান অর্থ নতুন উদ্যোগ।

প্রশ্ন ৩১: ‘কুলি-মজুর’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
উত্তর: ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের।

প্রশ্ন ৩২: কাদের হাতে মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে?
উত্তর: কুলি-মজুরের মতো শ্রমজীবী মানুষের হাতে।

প্রশ্ন ৩৩: কাদের শোষণ করে ধনিকশ্রেণি বিত্ত-সম্পদের মালিক হয়েছে?
উত্তর: কুলি-মজুরদের।

প্রশ্ন ৩৪: কবি ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় কীসের পক্ষে কলম ধরেছেন?
উত্তর: শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে।

কবি পরিচিতি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ৩৫: কাজী নজরুল ইসলাম ছেলেবেলায় লেটোর দলে কী করতেন?
উত্তর: গান করতেন।

প্রশ্ন ৩৬: তিনি কোন পেশায় কারিগর হয়েছিলেন?
উত্তর: রুটির দোকানের কারিগর।

প্রশ্ন ৩৭: যুদ্ধে যোগ দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কোন পদ পান?
উত্তর: সেনাবাহিনীর হাবিলদার।

প্রশ্ন ৩৮: ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে তিনি কী অপরাধে কারাবরণ করেন?
উত্তর: রাজদ্রোহের অপরাধে।

প্রশ্ন ৩৯: ‘সঞ্চয়ন’ ও ‘পিলে পটকা’ কী ধরনের গ্রন্থ?
উত্তর: ছোটদের কাব্যগ্রন্থ।

প্রশ্ন ৪০: ‘ঘুম জাগানো পাখি’ ও ‘ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি’ কার রচনা?
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের।

প্রশ্ন ৪১: ছোটদের জন্য তাঁর রচিত নাটকের নাম কী?
উত্তর: ‘পুতুলের বিয়ে’।

প্রশ্ন ৪২: ‘সন্ধ্যা’ গ্রন্থের অন্তর্গত রণ-সংগীত কোনটি?
উত্তর: ‘চল্ চল্ চল্’ গানটি।

প্রশ্ন ৪৩: কাজী নজরুল ইসলাম কোন দেশের জাতীয় কবি?
উত্তর: বাংলাদেশের জাতীয় কবি।

প্রশ্ন ৪৪: কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম কত খ্রিষ্টাব্দের কত তারিখে?
উত্তর: ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে।

প্রশ্ন ৪৫: কোন জেলার কোন গ্রামে তাঁর জন্ম?
উত্তর: বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে।

প্রশ্ন ৪৬: কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু কত খ্রিষ্টাব্দের কত তারিখে?
উত্তর: ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট।

প্রশ্ন ৪৭: তিনি কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: ঢাকায়।

Leave a Comment