সোনার তরী কবিতা: মূল বিষয়, গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

সোনার তরী কবিতার মূল বিষয়

মূলভাবঃ ‘সোনার তরী’ কবিতার মূলভাব হচ্ছে মানুষ মহান মানুষদের সৃষ্টিকর্মকে মনে রাখে কিন্তু স্রষ্টাকে ভুলে যায়। কবিতায় আকাশে মেঘের গর্জন ও ঘন বর্ষণের মধ্য দিয়ে কবি পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলেছেন। নদীর কূলে একা বসে আছেন এক কৃষক, যার কোনো ভরসা নেই। ধান কাটা শেষ হয়েছে, কিন্তু ভরা নদীর স্রোত এখন ক্ষুরের মতো ধারালো। কবি এখানে কৃষকের মাধ্যমে নিজের শিল্পস্রষ্টা সত্তাকে ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর ছোটো ধানখেতটি চারদিকে বাঁকা জল দিয়ে ঘেরা, যেন অনন্ত কালস্রোতে বিলীন হওয়ার মতো। ওপারে মেঘে ঢাকা একটি গ্রাম দেখা যায়, যেন গাছের ছায়ায় কালো মাখানো। হঠাৎ এক মাঝি গান গেয়ে নৌকা বেয়ে পারে আসতে থাকে, যাকে দেখে কৃষকের মনে হয় তিনি তাকে চেনেন। মাঝি ভরা পালে চলে যায়, কোথাও ফিরে তাকায় না। এ নির্মোহ মাঝি মহাকালের প্রতীক। কৃষক তাকে অনুরোধ করেন, নৌকাটি একবার কূলে ভিড়াতে। তিনি তাঁর সোনার ধান নৌকায় তুলে দিতে চান, শুধু একটি হাসি বিনিময়ে। কৃষক তাঁর সারা জীবনের সঞ্চিত সব ধান স্তরে স্তরে সাজিয়ে নৌকায় তুলে দেন। কিন্তু নৌকাটি ছোট হওয়ায় সেখানে কৃষকের নিজের জন্য আর জায়গা থাকে না। শেষ পর্যন্ত কৃষক শূন্য নদীর তীরে পড়ে থাকেন, যার যা কিছু ছিল সব নিয়ে গেছে সোনার তরী। কবি এখানে বলতে চেয়েছেন, মহাকাল মানুষের সৃষ্টি নিয়ে নেয়, কিন্তু স্রষ্টাকে ফেলে যায় বিস্মৃতি ও অবহেলায়।

সোনার তরী কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

গগনে → আকাশে

গরজে → গর্জন করে / গম্ভীর শব্দ করে

ঘন বরষা → প্রচণ্ড বৃষ্টি / ভারী বর্ষণ

কূলে → নদীর তীরে / পাড়ে

নাহি ভরসা → কোনো আশ্রয় নেই / ভরসা নেই

রাশি রাশি → স্তূপ করে / অনেক পরিমাণে

ভারা ভারা → ধান রাখার বড় পাত্রপূর্ণ

ক্ষুরধারা → ক্ষুরের মতো ধারালো স্রোত

খরপরশা → ধারালো বর্শার মতো

বাঁকা জল → ঘুরপাক খাওয়া পানি

তরুছায়ামসী-মাখা → গাছের ছায়ার কালো রঙে মাখানো

মেঘে ঢাকা → মেঘে আচ্ছাদিত

প্রভাতবেলা → সকালবেলা

এপারে → নদীর এপারে / যে পাশে কৃষক আছে

তরী বেয়ে → নৌকা চালিয়ে / নৌকা বেয়ে

ভরা পালে → পূর্ণ পাল তুলে / সব পাল লাগিয়ে

নিরুপায় → উপায়হীন / কিছু করার নেই

ঢেউগুলি ভাঙে দুধারে → ঢেউ দুদিকে ভেঙে পড়ছে

বিদেশে → অন্য দেশে / অচেনা জায়গায়

ভিড়াও তরী → নৌকা ভিড়াও / নৌকা লাগাও

কূলেতে এসে → তীরে এসে

ক্ষণিক হেসে → একটু হেসে / মুহূর্তের জন্য হাসি দিয়ে

তরণী-পরে → নৌকার ওপরে

থরে বিথরে → স্তরে স্তরে / সুবিন্যস্ত করে

করুণা করে → দয়া করে / করুণা দেখিয়ে

ঠাঁই নাই → জায়গা নেই

শ্রাবণগগন → শ্রাবণ মাসের আকাশ

শূন্য নদীর তীরে → ফাঁকা নদীর পাড়ে

রহিনু পড়ি → পড়ে রইলাম / থেকে গেলাম

নানামুখী ব্যাখ্যা → নানা ধরণের অর্থ ও বিশ্লেষণ

অভিষিক্ত → সিক্ত / পূর্ণ / সমৃদ্ধ

গূঢ় রহস্য → গভীর রহস্য

স্মারক → নিদর্শন / চিহ্ন / পরিচায়ক

চিরায়ত আবেদন → চিরকালীন আকর্ষণ / স্থায়ী মাধুর্য

উৎকণ্ঠিত → উদ্বিগ্ন / চিন্তিত

সকাতরে → মিনতি করে / কাতর হয়ে

গুমরে মরে → চুপচাপ কষ্ট পায় / বেদনায় নীরব থাকে

নিবিড়ভাবে → গভীরভাবে / খুব ঘনিষ্ঠভাবে

জীবনদর্শন → জীবনের মতবাদ / জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি

সৃজনশীল কর্মসম্ভার → সৃষ্টিশীল কাজের সংগ্রহ

ব্যক্তিসত্তা → নিজের অস্তিত্ব / মানুষ হিসেবে আমিত্ব

কালগ্রাস → সময়ের গিলে ফেলা / সময়ের ধ্বংস

সোনার তরী কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

কবিতা থেকে জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ১: ‘সোনার তরী’ কবিতার কবি কে?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

প্রশ্ন ২: ‘সোনার তরী’ কবিতায় প্রথম পংক্তিতে আকাশে কী করে?
উত্তর: মেঘ গর্জন করে।

প্রশ্ন ৩: নদীর কূলে কে বসে আছে?
উত্তর: কৃষক

প্রশ্ন ৪: ‘সোনার তরী’ কবিতায় ধান কাটা শেষ হলে কী এল?
উত্তর: বরষা (বৃষ্টি)।

প্রশ্ন ৫: ভরা নদী কী রকম হয়েছে?
উত্তর: ক্ষুরধারা (ক্ষুরের মতো ধারালো)।

প্রশ্ন ৬: ‘সোনার তরী’ কবিতায় কৃষকের খেতটি কেমন?
উত্তর: ছোটো।

প্রশ্ন ৭: ‘আমি একেলা’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: কৃষক নিঃসঙ্গ অবস্থা।

প্রশ্ন ৮: ‘সোনার তরী’ কবিতায় চারিদিকে কী করিছে খেলা?
উত্তর: বাঁকা জল।

প্রশ্ন ৯: ‘সোনার তরী’ কবিতায় পরপারের গ্রামটি কেমন?
উত্তর: মেঘে ঢাকা ও তরুছায়ায় মাখানো।

প্রশ্ন ১০: ‘সোনার তরী’ কবিতায় গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে?
উত্তর: এক মাঝি।

প্রশ্ন ১১: মাঝিকে দেখে কবির কী মনে হয়?
উত্তর: মনে হয় যেন তাকে চেনেন।

প্রশ্ন ১২: ‘সোনার তরী’ কবিতায় মাঝি কিসের প্রতীক?
উত্তর: মহাকালের প্রতীক।

প্রশ্ন ১৩: কৃষক মাঝিকে কী করতে অনুরোধ করেছেন?
উত্তর: নৌকা কূলে ভিড়াতে।

প্রশ্ন ১৪: ‘সোনার তরী’ কবিতায় কবি মাঝিকে কী দিয়ে যেতে চান?
উত্তর: সোনার ধান।

প্রশ্ন ১৫: ‘তরণী-পরে’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: নৌকার ওপরে।

প্রশ্ন ১৬: ‘সোনার তরী’ কবিতায় কবি কীভাবে ধান তুলে দিতে চান?
উত্তর: থরে বিথরে (স্তরে স্তরে)।

প্রশ্ন ১৭: ‘আমারে লহো করুণা করে’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: নিজেকেও নৌকায় তুলে নিতে চান।

প্রশ্ন ১৮: নৌকা কীসে ভরে গিয়েছে?
উত্তর: সোনার ধানে।

প্রশ্ন ১৯: ‘সোনার তরী’ কবিতায় শেষ পর্যন্ত কৃষক কোথায় পড়ে রইলেন?
উত্তর: শূন্য নদীর তীরে।

প্রশ্ন ২০: ‘যাহা ছিল’ সব কে নিয়ে গেল?
উত্তর: সোনার তরী।

প্রশ্ন ২১: ‘সোনার তরী’ কবিতা অনুসারে মহাকাল কী নিয়ে যায়?
উত্তর: মানুষের সৃজনশীল কর্মসম্ভার।

শব্দার্থ ও পাঠ পরিচিতি থেকে জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ২২: ‘গরজ’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: গর্জন করা।

প্রশ্ন ২৩: ‘ভারা ভারা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ধান রাখার পাত্রের সমষ্টি।

প্রশ্ন ২৪: ‘ক্ষুরধারা’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ক্ষুরের মতো ধারালো স্রোত।

প্রশ্ন ২৫: ‘খরপরশা’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ধারালো বর্শার মতো।

প্রশ্ন ২৬: ‘চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা’ পংক্তিতে ‘বাঁকা জল’ কীসের প্রতীক?
উত্তর: অনন্ত কালস্রোতের প্রতীক।

প্রশ্ন ২৭: ‘তরুছায়ামসী-মাখা’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ওপারের গ্রামটি গাছের ছায়ার কালো রঙে মাখানো।

প্রশ্ন ২৮: ‘গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে’ – এখানে ‘মাঝি’ কিসের প্রতীক?
উত্তর: নির্মোহ মহাকালের প্রতীক।

প্রশ্ন ২৯: ‘চিনি উহারে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: আগন্তুক মাঝিকে চেনা মনে হলেও কৃষক বা কবির সংশয় থেকে যায়।

প্রশ্ন ৩০: ‘বিদেশ’ শব্দটি এখানে কীসের প্রতীক?
উত্তর: চিরায়ত শিল্পলোকের প্রতীক।

প্রশ্ন ৩১: ‘বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে’ বলতে কৃষক কী চান?
উত্তর: চিরায়ত শিল্পলোকে ঠাঁই পেতে চান।

প্রশ্ন ৩২: ‘আমার সোনার ধান’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ব্যঞ্জনার্থে শিল্পস্রষ্টা কবির সৃষ্টিসম্ভার।

প্রশ্ন ৩৩: ‘দিয়েছি ভরে’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: সমগ্র সৃষ্টি মহাকালের নৌকায় তুলে দেওয়া।

প্রশ্ন ৩৪: ‘থরে বিথরে’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: স্তরে স্তরে ও সুবিন্যস্ত রূপে।

প্রশ্ন ৩৫: ‘এখন আমারে লহো করুণা করে’ বলতে কবি কী চান?
উত্তর: সৃষ্টির স্রষ্টা যেন মহাকালের নৌকায় স্থান পান।

প্রশ্ন ৩৬: সোনার তরীতে স্থান সংকুলান হয় না কার?
উত্তর: ব্যক্তিসত্তা ও শারীরিক অস্তিত্বের।

প্রশ্ন ৩৭: ‘শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: নিঃসঙ্গ অপূর্ণতার বেদনা ও অনিবার্য মৃত্যুর প্রতীক্ষা।

প্রশ্ন ৩৮: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সোনার তরী প্রসঙ্গে কী লিখেছেন?
উত্তর: মহাকাল আমার সর্বস্ব নিয়ে যায়, কিন্তু আমাকে বিস্মৃতি ও অবহেলায় ফেলে যায়।

প্রশ্ন ৩৯: ‘সোনার তরী’ কোন কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা?
উত্তর: ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের।

প্রশ্ন ৪০: ‘সোনার তরী’ কবিতাটি কীসের জন্য বিশেষভাবে আলোচিত?
উত্তর: নানামুখী ব্যাখ্যা ও নতুন তাৎপর্যের জন্য।

প্রশ্ন ৪১: ‘সোনার তরী’ কবিতায় কৃষক কীসের অপেক্ষায় ছিল?
উত্তর: সোনার ধানের সম্ভার নিয়ে।

প্রশ্ন ৪২: ‘সোনার তরী’ কবিতায় কী শিক্ষা দেওয়া হয়েছে?
উত্তর: মহাকাল সৃষ্টি নিয়ে যায়, কিন্তু স্রষ্টাকে ফেলে যায়।

প্রশ্ন ৪৩: ‘সোনার তরী’ কবিতার ছন্দ কী?
উত্তর: মাত্রাবৃত্ত ছন্দ।

কবি পরিচিতি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ৪৪: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত খ্রিষ্টাব্দের কত তারিখে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মে।

প্রশ্ন ৪৫: তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: ভারতের কলকাতায়।

প্রশ্ন ৪৬: তাঁর সাহিত্যসাধনার বৃহৎকাল কোন যুগ নামে পরিচিত?
উত্তর: ‘রবীন্দ্রযুগ’ নামে।

প্রশ্ন ৪৭: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম কাব্য কোনটি?
উত্তর: ‘বনফুল’।

প্রশ্ন ৪৮: ‘বনফুল’ কাব্যটি তাঁর কত বছর বয়সে প্রকাশিত হয়?
উত্তর: পনেরো বছর বয়সে।

প্রশ্ন ৪৯: কোন গ্রন্থের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন?
উত্তর: ‘গীতাঞ্জলি’ গ্রন্থের জন্য।

প্রশ্ন ৫০: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পান কত খ্রিষ্টাব্দে?
উত্তর: ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে।

প্রশ্ন ৫১: কোন জাতীয় সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পথিকৃৎ ও শ্রেষ্ঠ শিল্পী?
উত্তর: বাংলা ছোটগল্পের পথিকৃৎ।

প্রশ্ন ৫৩: ‘ক্ষণিকা’ কার রচনা?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।

প্রশ্ন ৫৪: ‘বলাকা’ কোন ধরনের গ্রন্থ?
উত্তর: কাব্যগ্রন্থ।

প্রশ্ন ৫৫: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ কাব্যগ্রন্থ কোনটি?
উত্তর: ‘শেষ লেখা’।

প্রশ্ন ৫৬: ‘বিসর্জন’ ও ‘চিত্রাঙ্গদা’ কী ধরনের রচনা?
উত্তর: কাব্যনাট্য।

প্রশ্ন ৫৭: ‘কথা’ ও ‘কাহিনি’ কোন ধরনের সংকলন?
উত্তর: কাহিনি-কবিতার সংকলন।

প্রশ্ন ৫৮: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা?
উত্তর: ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয়ের।

প্রশ্ন ৫৯: ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের ইংরেজি নাম কি?
উত্তর: ইংরেজি নাম ‘Song Offerings’

প্রশ্ন ৬০: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু কত খ্রিষ্টাব্দের কত তারিখে?
উত্তর: ১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট।

Leave a Comment