সুচেতনা কবিতার মূলভাব, শব্দার্থ ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

সুচেতনা কবিতার মূলভাব

মূলভাবঃ জীবনানন্দ দাশের ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি একটি সুন্দর ও কল্যাণময় চেতনার কথা বলেছেন, যাকে তিনি ‘সুচেতনা’ নামে ডেকেছেন। কবির কাছে এই সুচেতনা যেন দূরের একটি দ্বীপ, যা বিকেলের তারার কাছাকাছি অবস্থিত। সেই দ্বীপের দারুচিনি বনের আড়ালে গভীর নির্জনতা বিরাজ করছে। কবি জানেন, পৃথিবীর যুদ্ধ, রক্তপাত ও নানা অর্জন সত্য, কিন্তু তিনি মনে করেন, পৃথিবীর ধ্বংস আর হিংসাই শেষ সত্য নয়। মানুষের জন্য ভালোবাসা ও কল্যাণ করতে গিয়ে তাঁর নিজের হাতেও ভাই, বোন, বন্ধু ও আপনজনের মৃত্যু ঘটেছে। অর্থাৎ ভালো কিছু প্রতিষ্ঠার পথেও অনেক সময় রক্তপাত ও ধ্বংস নেমে আসে। বর্তমানে পৃথিবী নানা অসুখ, দুঃখ ও বিপদের মধ্যে রয়েছে, তবুও মানুষ এই পৃথিবীর কাছে অনেক ঋণী। কবি মনে করেন, সুচেতনার দেখানো পথেই মানুষের মনে আলোর সৃষ্টি করতে হবে এবং এই পথ ধরেই পৃথিবী ধীরে ধীরে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাবে। এই মুক্তির কাজ একদিনে সম্ভব নয়; যুগ যুগ ধরে জ্ঞানী ও মহান মানুষেরা এ কাজ করে আসছেন। কবি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর বাতাস একদিন সূর্যের আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তিনি ক্লান্ত হলেও আশা হারাননি। তিনি ভবিষ্যতের সেই নাবিকদের হাতে একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ে দিতে চান, যদিও সেই স্বপ্ন পূরণ হবে আজ নয়, অনেক দূরের কোনো শেষ ভোরে। পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে কবি জীবনের কাছ থেকে অনেক কিছু পাওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীর প্রতি নিজের ঋণও অনুভব করেছেন, বিশেষ করে শিশিরভেজা উজ্জ্বল ভোরের মুহূর্তে। তাঁর বিশ্বাস, দীর্ঘ অন্ধকার রাতের পর যেমন সূর্য ওঠে, তেমনি একদিন এই পৃথিবীর অন্ধকারের বুকেও নতুন আলোর সূর্যোদয় ঘটবে।

সুচেতনা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

সুচেতনা – শুভ চেতনা / ভালো বোধ / সঠিক উপলব্ধি

দূরতর দ্বীপ – অনেক দূরের দ্বীপ

বিকেলের নক্ষত্র – সন্ধ্যার তারা

দারুচিনি-বনানী – দারুচিনি গাছের বন

ফাঁকে – ভিতরে / মাঝখানে

নির্জনতা – একাকিত্ব / নিঃসঙ্গতা / মানুষের হট্টগোল নেই এমন ভাব

রণ – যুদ্ধ / লড়াই

রক্ত – রক্তপাত / হত্যা

সফলতা – জয় / কৃতকার্যতা

রূঢ় রৌদ্র – কঠিন রোদ / প্রখর তাপ

নিহত – মারা গেছে / খুন হয়েছে

পরিজন – নিজের লোক / আত্মীয়স্বজন

গভীরতর অসুখ – খুব বড় রোগ / মারাত্মক সমস্যা

ঋণী – কৃতজ্ঞ / কর্জি / দেনা থাকা

ক্রমমুক্তি – ধীরে ধীরে মুক্তি /পর্যায় ক্রমে মুক্তি

মনীষী – জ্ঞানী ব্যক্তি / পণ্ডিত / মহাপুরুষ

সূর্যকরোজ্জ্বল – সূর্যের কিরণে উজ্জ্বল

ক্লান্তিহীন নাবিক – যে কখনো ক্লান্ত হয় না এমন নাবিক / অক্লান্ত নাবিক

অন্তিম প্রভাত – শেষ সকাল / চরম ভোর / সবশেষে আসা সকাল

মাটি-পৃথিবীর টান – মাটির টান / পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণ

অনুভব করে – মনে করে / উপলব্ধি করে

শিশির শরীর – শিশির ভেজা দেহ / ভিজে ঘাস

সমুজ্জ্বল ভোরে – খুব উজ্জ্বল সকালবেলা

শাশ্বত রাত্রি – চিরন্তন রাত / যে রাত কখনো শেষ হয় না

অনন্ত সূর্যোদয় – শেষ নেই এমন সূর্য ওঠা / চিরস্থায়ী আলো

সম্বোধনে – ডাক দিয়ে / নাম ধরে সম্বোধন করে

আরাধ্য – পূজনীয় / যাকে পূজা করা হয়

শিল্পিত – সুন্দরভাবে প্রকাশ করা

নিহিত – লুকিয়ে আছে / অবস্থিত

নিঃশেষিত – শেষ হয়ে যাওয়া / ফুরিয়ে যাওয়া

ব্যাধি – রোগ / সমস্যা

ইহলৌকিক – এই পৃথিবীর / সংসারের

জীবন্ময় – প্রাণবন্ত / সজীব

সুচেতনা কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন ১: ‘সুচেতনা’ কবিতার কবি কে?
উত্তর: জীবনানন্দ দাশ।

প্রশ্ন ২: কবি সুচেতনাকে কীসের সাথে তুলনা করেছেন?
উত্তর: দূরতর দ্বীপের সাথে।

প্রশ্ন ৩: সুচেতনা কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: বিকেলের নক্ষত্রের কাছে।

প্রশ্ন ৪: দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে কী আছে?
উত্তর: নির্জনতা আছে।

প্রশ্ন ৫:সুচেতনা’ কবিতায় কোন গভীর অসুখের কথা উল্লেখ করা হয়েছে?
উত্তর: কবিতায় পৃথিবীর গভীর অসুখের কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন ৬: পৃথিবীর ধ্বংসাত্মক দিকটিকে কবি কী বলেন?
উত্তর: শেষ সত্য নয়।

প্রশ্ন ৭: কবি আজকে কীরকম রৌদ্রে ঘুরেছেন?
উত্তর: অনেক রূঢ় রৌদ্রে।

প্রশ্ন ৮: ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি কী দিতে গিয়ে নিহত দেখেছেন?
উত্তর: ভালোবাসা দিতে গিয়ে।

প্রশ্ন ৯:  ‘সুচেতনা’ কবিতায় কার হাতে নিহত হয়েছে ভাই-বোনেরা?
উত্তর: কবির নিজের হাতে।

প্রশ্ন ১০: পৃথিবীর ক্রমমুক্তি ঘটানোর জন্য কোন আলোটি জ্বালাতে হবে বলে কবি মনে করেন?
উত্তর: সুচেতনার আলো জ্বালাতে হবে বলে কবি মনে করেন।

প্রশ্ন ১১:  ‘সুচেতনা’ কবিতায় মানুষ কার কাছে ঋণী?
উত্তর: পৃথিবীর কাছে।

প্রশ্ন ১২: কবি কোন পথে আলো জ্বালাতে বলেছেন?
উত্তর: সুচেতনার পথে।

প্রশ্ন ১৩: কোন পথে পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে?
উত্তর: সুচেতনার পথে।

প্রশ্ন ১৪:  ‘সুচেতনা’ কবিতায় মুক্তির কাজ কার?
উত্তর: বহু শতাব্দীর মনীষীর কাজ।

প্রশ্ন ১৫: বহু শতাব্দী ধরে মনীষীরা কোন কাজটি করে আসছেন?
উত্তর: পৃথিবীর ক্রমমুক্তির কাজটি।

প্রশ্ন ১৬:  ‘সুচেতনা’ কবিতায় এ-বাতাস কীরকম?
উত্তর: পরম সূর্যকরোজ্জ্বল।

প্রশ্ন ১৭:  ‘সুচেতনা’ কবিতায় ক্লান্ত কিন্তু ক্লান্তিহীন কারা?
উত্তর: নাবিকেরা।

প্রশ্ন ১৮: কবি কাদের হাতে ভালো মানবসমাজ গড়ে দিতে চান?
উত্তর: ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে।

প্রশ্ন ১৯:  ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবে ভালো মানবসমাজ গড়ে দেওয়া হবে?
উত্তর: আজ নয়, ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।

প্রশ্ন ২০: কীসের টানে কবি মানবজন্মের ঘরে এসেছেন?
উত্তর: মাটি-পৃথিবীর টানে।

প্রশ্ন ২১: সূর্যকিরণে উজ্জ্বল বাতাসের সাথে কবি কোন বিষয়টির তুলনা করেছেন?
উত্তর: সূর্যকরোজ্জ্বল বাতাসের সাথে ভালো মানবসমাজের তুলনা করেছেন।

প্রশ্ন ২২: যারা ক্লান্ত কিন্তু ক্লান্তিহীন, সেই নাবিকদের হাত দিয়ে কবি কী নির্মাণ করতে চান?
উত্তর: ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে কবি ভালো মানবসমাজ নির্মাণ করতে চান।

প্রশ্ন ২৩: ভালো মানবসমাজ গঠনের কাজটি কখন শেষ হবে বলে কবি মনে করেন?
উত্তর: দূর অন্তিম প্রভাতে।

প্রশ্ন ২৪: শাশ্বত রাত্রির বুকে কী থাকে?
উত্তর: অনন্ত সূর্যোদয়।

প্রশ্ন ২৫: কবির বিশ্বাস অনুযায়ী অন্ধকারের পরে কী আসে?
উত্তর: আলো বা সূর্যোদয়।

প্রশ্ন ২৬: কবি ‘ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: অনেক দূরের শেষ সকালে।

প্রশ্ন ২৭: শিশির শরীর স্পর্শ করার ঘটনাটি দিনের কোন সময় ঘটেছে?
উত্তর: সমুজ্জ্বল ভোরে।

প্রশ্ন ২৮: ‘মনীষী’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: জ্ঞানী ব্যক্তি বা পণ্ডিত।

প্রশ্ন ২৯: ‘শাশ্বত রাত্রি’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: চিরন্তন রাত।

প্রশ্ন ৩০: ‘শিশির শরীর’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: শিশির ভেজা দেহ বা ভিজে ঘাস।

প্রশ্ন ৩১: ‘রূঢ় রৌদ্র’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কঠিন রোদ বা প্রখর তাপ।

প্রশ্ন ৩২: ‘সুচেতনা’ শব্দটি দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: এক শুভ চেতনা বোঝাতে চেয়েছেন।

প্রশ্ন ৩৩: কবির কল্পনায় সুচেতনা কীরকম?
উত্তর: দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন।

প্রশ্ন ৩৪: শাশ্বত রাত্রির বুকে কী প্রকাশ পাবে বলে কবি বিশ্বাস করেন?
উত্তর: অনন্ত সূর্যোদয়।

প্রশ্ন ৩৫: সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি কী ঘটেছে?
উত্তর: বহু যুদ্ধ, রক্তপাত ও প্রাণহানি ঘটেছে।

প্রশ্ন ৩৬: সুচেতনা কোন সত্তাকে অতিক্রম করতে পারে?
উত্তর: পৃথিবীর গভীরতর ব্যাধিকে অতিক্রম করতে পারে।

প্রশ্ন ৩৭: প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও কী ঘটে?
উত্তর: অগণিত প্রাণহানি ও রক্তপাত ঘটে।

প্রশ্ন ৩৮: পৃথিবীর গভীর অসুখ থেকে মুক্তির পথ কী?
উত্তর: শুভ চেতনা বা সুচেতনা।

প্রশ্ন ৩৯: ‘সুচেতনা’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে?
উত্তর: ‘বনলতা সেন’ (১৯৪২) কাব্যগ্রন্থ থেকে।

প্রশ্ন ৪০: জীবনানন্দ দাশের জন্ম কত খ্রিষ্টাব্দের কত তারিখে?
উত্তর: ১৮৯৯ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি।

প্রশ্ন ৪১: জীবনানন্দ দাশ কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: বরিশালে।

প্রশ্ন ৪২: জীবনানন্দ দাশের পিতার নাম কী?
উত্তর: সত্যানন্দ দাশ।

প্রশ্ন ৪৩: জীবনানন্দ দাশের মায়ের নাম কী?
উত্তর: কুসুমকুমারী দাশ।

প্রশ্ন ৪৪: জীবনানন্দ দাশের মা কিসের জন্য বিখ্যাত ছিলেন?
উত্তর: সেকালের বিখ্যাত কবি হিসেবে।

প্রশ্ন ৪৫: জীবনানন্দ দাশ কার কাছ থেকে কবিতা লেখার প্রেরণা পেয়েছিলেন?
উত্তর: মায়ের কাছ থেকে।

প্রশ্ন ৪৬: জীবনানন্দ দাশ মূলত কী পেশায় জীবন অতিবাহিত করেন?
উত্তর: ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে।

প্রশ্ন ৪৭: জীবনানন্দ দাশ কবিতায় কী ধরনের জগৎ তৈরি করেন?
উত্তর: সূক্ষ্ম ও গভীর অনুভবের জগৎ।

প্রশ্ন ৪৮: জীবনানন্দ দাশের কবিতায় কোন ছবি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে?
উত্তর: গ্রামবাংলার নিসর্গের ছবি।

প্রশ্ন ৪৯: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনানন্দের কাব্যবৈশিষ্ট্যকে কী বলে আখ্যায়িত করেছেন?
উত্তর: ‘চিত্ররূপময়’ বলে।

প্রশ্ন ৫০: বুদ্ধদেব বসু তাঁকে কী বলে আখ্যায়িত করেছেন?
উত্তর: ‘নির্জনতম কবি’ বলে।

প্রশ্ন ৫১: তাঁর নিসর্গবিষয়ক কবিতা কোন আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছিল?
উত্তর: ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে।

প্রশ্ন ৫২: জীবনানন্দ দাশ জীবনের কোন দিকটি সন্ধান করতে চেয়েছেন?
উত্তর: জীবন ও জগতের রহস্য ও মাহাত্ম্য।

প্রশ্ন ৫৩: তাঁর কাব্যে ব্যক্তিমানুষের কোন অনুভূতি ফুটে উঠেছে?
উত্তর: নিঃসঙ্গতা ও যন্ত্রণা।

প্রশ্ন ৫৪: ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কার রচনা?
উত্তর: জীবনানন্দ দাশের।

প্রশ্ন ৫৫: জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’ কোন ধরনের রচনা?
উত্তর: কাব্যগ্রন্থ।

প্রশ্ন ৫৬: ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থটির লেখক কে?
উত্তর: জীবনানন্দ দাশ।

প্রশ্ন ৫৭: ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ কার রচনা?
উত্তর: জীবনানন্দ দাশের।

প্রশ্ন ৫৮: জীবনানন্দ দাশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ কোনটি?
উত্তর: ‘রূপসী বাংলা’।

প্রশ্ন ৫৯: আধুনিক বাংলা কাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কে?
উত্তর: জীবনানন্দ দাশ।

প্রশ্ন ৬০: জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু কত খ্রিষ্টাব্দের কত তারিখে?
উত্তর: ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে অক্টোবর।

প্রশ্ন ৬১: জীবনানন্দ দাশ কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: কলকাতায়।

প্রশ্ন ৬২: কীভাবে জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু হয়?
উত্তর: ট্রাম দুর্ঘটনায় আকস্মিকভাবে।

Leave a Comment