ঝর্ণার গান কবিতার মূলভাব, শব্দার্থ ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

ঝর্ণার গান কবিতার মূলভাব

মূলভাবঃ ‘ঝরনার গান’ কবিতায় ঝরনাকে কবি চঞ্চল ও প্রাণবন্ত এক সত্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ঝরনা যেন চপল পায়ে ছুটে চলা এবং পরীদের মতো মিষ্টি গান গাওয়া এক আনন্দময় প্রাণ। তার শরীর ও মনে সব সময় আনন্দের পুলক জাগে। সে নরম পাথরের ওপর দুলতে দুলতে পা ফেলে এগিয়ে চলে। দুপুরে যখন ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে, পথ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বন ঘুমিয়ে থাকে, তখনও ঝরনা একা একা গান গেয়ে দিনরাত ছুটে চলে। সামনে ঝুঁকে থাকা পাহাড় ভয় দেখালেও সে একটুও ভয় পায় না। নিজের গতিতে ছুটতে ছুটতে তার পায়ে যেন টগর ফুলের নূপুর বেজে ওঠে। ঝরনার ঠান্ডা পানির স্পর্শে পাহাড়ের জমে থাকা বরফও গলে যায়। ঝরনার কোনো ক্লান্তি নেই, তাই সে খিলখিল করে হাসে এবং বুলবুলির ডাকের মতো শব্দ করে। বনের গাছে কালসার পাখির দল ঘুরে বেড়ায়, আর পাথরগুলো ডালচিনির মতো রঙ ধারণ করে। ঝরনা কখনো লাফিয়ে চলে, কখনো পাহাড়ের পাথরের ঘর কাঁপিয়ে দেয় এবং টিলার গায়ে যেন ডালিমের মতো লাল সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে। তৃষ্ণার্ত চাতক পাখি যখন ফটিক জলের আশায় ডাকে, তখন ঝরনাও তার কাছে ছুটে যায়। চলার পথে সে পাথরের বুকে আঘাত করে চারদিকে ঝিলমিল আলো ছড়িয়ে দেয়। এভাবে ঝরনা নিজের আনন্দে দুলতে দুলতে ছুটে চলে এবং তার চঞ্চলতা ও মধুর শব্দে চারপাশের প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

ঝর্ণার গান কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

চপল পায় – চঞ্চল পায়ে / অস্থির পায়ে / দ্রুত চলা পায়ে

ধাই – দৌড়াই

পরীর গান – কল্পনার গান / জাদুকরী গান

পুলক – আনন্দ / রোমাঞ্চ / সোহাগ

বিভোল – বিভোর / মজে আছে / অচেতন

শিথিল সব শিলার পর – নরম সব পাথরের ওপরে

চরণ – পা

থুই – রাখি

দোদুল মন – দোলাতে থাকা মন / অস্থির মন

ঝিমায় – ঢুলে পড়ে / ক্লান্ত হয়

বিজন দেশ – জনশূন্য জায়গা / নির্জন দেশ

কূজন – পাখির ডাক

বাজাই তাল – তাল ঠুকে / দাপাদাপি করে

একলা – একা

সাঁঝ সকাল – সন্ধ্যা ও সকাল

ঝুঁকিয়ে ঘাড় – ঘাড় বাঁকিয়ে

ঝুম-পাহাড় – নীরব পাহাড়

চোখ পাকায় – চোখ ঘুরিয়ে ভয় দেখায়

শঙ্কা – ভয় / আশঙ্কা

সমান যাই – সমান বেগে চলি

টগর-ফুল-নূপুর – টগর ফুলের পায়ের আংটি / টগর ফুলের তৈরি নূপুর

হিম ললাট – বরফের মাথা / তুষারাবৃত চূড়া

ঘামল মোর উদ্ভবে – আমার স্পর্শে গলে গেল / ঘামে ভিজল

টুটুল হার – হারিয়ে যাওয়া মালা / ছেঁড়া হার

উৎসব – আনন্দের অনুষ্ঠান

খেয়াল নাই – কোন মাথা ব্যাথা নেই / কিছু যায় আসে না

সংবাদই – খবর / হদিস

ধাই লীলায় – খেলার ছলেই দৌড়াই

খিলখিলাই – খিলখিল করে হাসি

বুলবুলির বোল সাধি – বুলবুলি পাখির ডাক নকল করি

বন-ঝাউয়ের ঝোপ – বনের ঝাউগাছের ঝোপ

কালসার দল – কালসার পাখির দল

শিং শিলায় – শিংওয়ালা পাথরের ওপর

ডালচিনির রং – ডালচিনির মতো রং / হালকা বাদামি বা লালচে রং

ঝাঁপিয়ে যাই – লাফিয়ে পড়ি / ডিঙিয়ে যাই

লাফিয়ে ধাই – লাফিয়ে দৌড়াই

দুলিয়ে যাই অচল-ঠাঁট – অচল জায়গাকে দুলিয়ে দেই / স্তব্ধ পাহাড়কেও দোলাই

নাড়িয়ে যাই – নেড়েচেড়ে দিই / আলোড়িত করি

বাড়িয়ে যাই – বাড়িয়ে দিই / বাড়িয়ে যাই

টিলার গায় ডালিম-ফাট – টিলার ওপরে ডালিম ফাটিয়ে দিই

শালিক শুক – শালিক পাখি ও টিয়া পাখি

বুলায় মুখ – ঘষে মুখ / মুখ নেড়ে

থল-ঝাঁঝির মখমলে – স্থলের শেওলার মখমলের মতো নরম জায়গায়

জরির জাল আংরাখায় – জরি দিয়ে তৈরি লম্বা পোশাকে

অঙ্গ মোর ঝলমলে – আমার শরীর ঝলমল করছে

নিম্নে ধাই – নিচের দিকে দৌড়াই

হাঁকছে – ডাকছে / চিৎকার করছে

কণ্ঠাতেই তৃষ্ণা – গলাতেই পিপাসা / কণ্ঠ শুকিয়ে যাওয়া

নিক না – পান করুক না

পাঁক ছেঁকে – পঙ্ক ছেকে / কাদা ছেঁকে

গরজ যার – গর্জন যার / যে বড়াই করে

জল স্যাঁচার – জল সেচ করে / জল দেয়

পাতকুয়ায় – পাতকুয়ার জলে / অপরিষ্কার কুয়ার জলে

সুন্দরের তৃষ্ণা – সৌন্দর্য পাবার তৃষ্ণা / সুন্দরের জন্য পিপাসা

তার খোঁজেই বিরাম নেই – তার খোঁজেই আমার থামা নেই

বিলাই – বিতরণ করি

তান-তরল শ্লোক – সুরের হালকা কবিতা / মিষ্টি সুরের গান

চকোর – এক ধরনের পাখি (যে চাঁদের আলো পান করে বলে কল্পনা)

চন্দ্রমায় – চাঁদের আলো

মুগ্ধ-চোখ – মুগ্ধ চোখ / যে চোখ ভালো না দেখে

উপল-ঘায় – পাথরের আঘাতে

দিই ঝিলিক – ঝিলিক দিয়ে ওঠে / ঝকঝক করে

দুল দোলাই – দুলতে থাকা দোলাই / দুলিয়ে দিই

মনের ভোল লাগাই – মন ভুলিয়ে দিই

ঝিলমিলাই দিগ্বিদিক – চারদিক ঝিলমিল করে ওঠে

পুলকিত – আনন্দিত

গতিময় – সচল / গতিশীল

স্তব্ধ – নিশ্চল

পর্বত – পাহাড়

ধ্বনিমাধুর্য – শব্দের মাধুর্য / সুরেলা আওয়াজ

বর্ণবৈভব – রঙের জাঁকজমক

অমিয় স্বাদ – মিষ্টি স্বাদ / অমৃত

তুলনারহিত – তুলনা করা যায় না

অম্বুরাশি – জলরাশি

আঘাত হেনে – ঠেকে / ধাক্কা দিয়ে

মনোহর – সুন্দর / মনোরম

ঝর্ণার গান কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন ১: ‘ঝরনার গান’ কবিতার কবি কে?
উত্তর: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।

প্রশ্ন ২: ‘ঝরনার গান’ কবিতার ঝরনা কী ধাই?
উত্তর: চপল পায়ে ধাই।

প্রশ্ন ৩: ঝরনা কী গান গায়?
উত্তর: পরীর গান।

প্রশ্ন ৪: ঝরনার প্রাণ কেমন হয়?
উত্তর: বিভোল হয়।

প্রশ্ন ৫: ঝরনা কোথায় চরণ রাখে?
উত্তর: শিথিল সব শিলার পর।

প্রশ্ন ৬: দুপুর-ভোরে কী ডাকে?
উত্তর: ঝিঁঝিঁ ডাকে।

প্রশ্ন ৭: ‘ঝরনার গান’ কবিতার ঝিমায় কে?
উত্তর: পথ।

প্রশ্ন ৮: ‘ঝরনার গান’ কবিতার ঘুমায় কে?
উত্তর: বন।

প্রশ্ন ৯: ‘বিজন দেশ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: নির্জন দেশ।

প্রশ্ন ১০: ‘কূজন’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: পাখির ডাক।

প্রশ্ন ১১: ঝরনা কোথায় তাল বাজায়?
উত্তর: নিজের পায়ে।

প্রশ্ন ১২: ঝরনা কখন একলা গায় আর ধায়?
উত্তর: দিবস রাত, সাঁঝ সকাল।

প্রশ্ন ১৩: ‘ঝরনার গান’ কবিতার ঝুম-পাহাড় কী করে?
উত্তর: ভয় দ্যাখায়, চোখ পাকায়।

প্রশ্ন ১৪: ‘ঝরনার গান’ কবিতায় ঝরনার কী নেই?
উত্তর: শঙ্কা নেই।

প্রশ্ন ১৫: ঝরনার পায়ে কী বাজে?
উত্তর: টগর-ফুল-নূপুর।

প্রশ্ন ১৬: ‘খেয়াল নাই’ বলতে ঝরনা কী বোঝায়?
উত্তর: কোনো মাথা ব্যাথা নেই।

প্রশ্ন ১৭: ‘ঝরনার গান’ কবিতায় ঝরনা কীসের বোল সাধে?
উত্তর: বুলবুলির বোল।

প্রশ্ন ১৮: বন-ঝাউয়ের ঝোপগুলায় কে চরে?
উত্তর: কালসারের দল।

প্রশ্ন ১৯: ‘ঝরনার গান’ কবিতায় শিলা কীরকম রং ধরে?
উত্তর: ডালচিনির রং ধরে।

প্রশ্ন ২০: ‘ঝরনার গান’ কবিতায় শালিক ও শুক কী করে?
উত্তর: বুলায় মুখ।

প্রশ্ন ২১: ‘থল-ঝাঁঝির মখমলে’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: শেওলার নরম জায়গায়।

প্রশ্ন ২২: ‘আংরাখায়’ কী দ্বারা তৈরি?
উত্তর: জরির জাল।

প্রশ্ন ২৩: ‘ঝরনার গান’ কবিতায় ঝরনা কী শুনতে পায়?
উত্তর: ‘ফটিক জল’।

প্রশ্ন ২৪: ‘ঝরনার গান’ কবিতায় ‘ফটিক জল’ কে হাঁকছে?
উত্তর: চাতক পাখি।

প্রশ্ন ২৫: ‘বিলাই’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: বিতরণ করি।

প্রশ্ন ২৬: ‘তান-তরল শ্লোক’ কী?
উত্তর: সুরের হালকা কবিতা।

প্রশ্ন ২৭: ‘ঝরনার গান’ কবিতায় চকোর কী চায়?
উত্তর: চন্দ্রমা (চাঁদের আলো)।

প্রশ্ন ২৮: ঝরনা কী ভোলায়?
উত্তর: মন ভোলায়।

প্রশ্ন ২৯: ‘বিভোল’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: অচেতন, বিভোর, বিবশ, বিহ্বল।

প্রশ্ন ৩০: ‘বিজন’ ও ‘কূজন’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: বিজন অর্থ নির্জন ও কূজন অর্থ পাখির ডাক।

প্রশ্ন ৩১: ‘ঝুম পাহাড়’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: নীরব পাহাড় বা নির্জন পাহাড়।

প্রশ্ন ৩২: ‘হিম’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: তুষার বা বরফ।

প্রশ্ন ৩৩: ‘শুক’ কোন পাখি?
উত্তর: টিয়ে পাখি।

প্রশ্ন ৩৪: ‘থল’ ও ‘ঝাঁঝি’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: থল অর্থ স্থল ও ঝাঁঝি অর্থ বহুদিন ধরে জমা শেওলা।

প্রশ্ন ৩৫: ‘মখমল’ ও ‘আংরাখা’ কী?
উত্তর: মখমল অর্থ কোমল মিহি কাপড় ও আংরাখা অর্থ লম্বা ঢিলা পোশাক।

প্রশ্ন ৩৬: ‘ফটিক জল’ কোন পাখি?
উত্তর: চাতক পাখি।

প্রশ্ন ৩৭: ‘ফটিক জল’ পাখির ডাক কেমন শোনায়?
উত্তর: ‘ফটিক জল’ শব্দের মতো।

প্রশ্ন ৩৮: ‘বিলাই’ ও ‘তান’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: বিলাই অর্থ বিতরণ করা ও তান অর্থ সুর।

প্রশ্ন ৩৯: ‘তরল শ্লোক’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: লঘু বা হালকা চালের কবিতা।

প্রশ্ন ৪০: ‘চকোর’ পাখি কবিকল্পনায় কী করে?
উত্তর: চাঁদের আলো পান করে।

প্রশ্ন ৪১: ‘চন্দ্রমা’ ও ‘উপল ঘায়’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: চন্দ্রমা অর্থ চাঁদের আলো ও উপল ঘায় অর্থ পাথরের আঘাতে।

প্রশ্ন ৪২: ‘ঝরনার গান’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে?
উত্তর: ‘বিদায় আরতি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে।

প্রশ্ন ৪৩: কবিতাটির কী কী গুণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়?
উত্তর: ধ্বনিমাধুর্য ও বর্ণবৈভব।

প্রশ্ন ৪৪: সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম কত খ্রিষ্টাব্দে?
উত্তর: ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে।

প্রশ্ন ৪৫: তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: কলকাতার কাছাকাছি নিমতা গ্রামে।

প্রশ্ন ৪৬: তিনি কোন শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন?
উত্তর: বি.এ. শ্রেণি পর্যন্ত।

প্রশ্ন ৪৭: ছাত্রজীবন থেকেই সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কী করতেন?
উত্তর: কাব্যচর্চা করতেন।

প্রশ্ন ৪৮: ‘সন্ধিক্ষণ’ কার মৌলিক কাব্য?
উত্তর: সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের।

প্রশ্ন ৪৯: ‘বেণু ও বীণা’ ও ‘হোমশিখা’ কী ধরনের গ্রন্থ?
উত্তর: মৌলিক কাব্য।

প্রশ্ন ৫০: সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের একটি অনুবাদ কাব্যের নাম লেখ।
উত্তর: ‘তীর্থরেণু’।

প্রশ্ন ৫১: ‘তীর্থ-সলিল’ ও ‘ফুলের ফসল’ কার অনুবাদ?
উত্তর: সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের।

প্রশ্ন ৫২: ছন্দ নির্মাণে তিনি কেমন পরিচয় দিয়েছেন?
উত্তর: অসাধারণ নৈপুণ্যের পরিচয়।

প্রশ্ন ৫৩: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কী নামে পরিচিত?
উত্তর: ‘ছন্দের যাদুকর’।

প্রশ্ন ৫৪: সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যু কত খ্রিষ্টাব্দে?
উত্তর: ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে।

প্রশ্ন ৫৫: কত বছর বয়সে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরলোকগমন করেন?
উত্তর: মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে।

Leave a Comment