আসমানি কবিতা: মূলভাব, শব্দার্থ ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

আসমানি কবিতার মূলভাব

‘আসমানি’ কবিতায় জসীমউদ্দীন রসুলপুর গ্রামের গরিব শিশু আসমানির দারিদ্র্য ও দুঃখময় জীবনের করুণ চিত্র এঁকেছেন। তার বাড়িটি পাখির বাসার মতো, ভেন্না পাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি; একটু বৃষ্টি হলেই ছাদ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে, আর হাওয়া দিলে ঘর কাঁপে। আসমানিরা বছরের পর বছর সেই ঘরেই থাকে। তাদের পেট পুরে খাওয়া হয় না, বুকের হাড় বেরিয়ে আছে। অনাহারে কত দিন কেটেছে, তার সাক্ষী তাদের রোগা শরীর। তার মুখ থেকে হাসি উধাও, অভাব এসে সব হাসি মুছে দিয়েছে। পরনে ছেঁড়া তালি দেওয়া পোশাক, সোনালি গায়ের রঙকে যেন ঠাট্টা করছে। তার কালো চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, হাসি নেই। বাঁশির মতো সুরেলা গলাও নষ্ট হয়ে গেছে কান্নায়। আসমানিদের বাড়ির পাশে পুকুর, সেখানে ম্যালেরিয়ার মশা বাসা বাঁধে। সেই পুকুরের পানি দিয়ে রান্না-খাওয়া চলে, ফলে প্লীহা ও জ্বরে ভোগে আসমানি। এভাবেই কবি গরিব শিশুর প্রতি সহানুভূতি ও সামাজিক দায়বোধ জাগানোর চেষ্টা করেছেন।

আসমানি কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

আসমানি → এখানে একটি গরিব শিশুর নাম / আকাশের মতো সুন্দর (প্রসঙ্গে)

ভেন্না পাতা → এক ধরনের গাছের পাতা যা দিয়ে গরিব লোকেরা ঘরের ছাউনি তৈরি করে

ছানি → ছাউনি / চালা / ঘরের উপরের আবরণ

গড়িয়ে পড়ে পানি → জল গড়িয়ে নিচে পড়ে / ছাদ দিয়ে জল ঝরে

নড়বড় → টলমল / দুলছে / অস্থির

অনাহারে → না খেয়ে / খাবার না পেয়ে

হাসির প্রদীপ-রাশি → হাসির আলো / মুখের আনন্দ

থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে → চড় মেরে নিভিয়ে দিয়েছে

দারুণ অভাব আসি → খুব বড় দারিদ্র্য এসে

তালি → ছেঁড়া কাপড়ে দেওয়া প্যাঁচ / জোড়া

বাস → পোশাক / জামা / কাপড়

গার বরণ → গায়ের রঙ / শরীরের রং

উপহাস → ঠাট্টা / মজা / বিদ্রুপ

কৌতুক-হাসি → মজার হাসি / খেলার হাসি

অশ্রু রাশি রাশি → অনেক অশ্রু / প্রচুর চোখের পানি

শ্যাওলা-পানা → জলাশয়ের ভাসমান সবুজ আবর্জনা / শেওলা ও পানাপানা

কিল-বিল-বিল করে → অনেকগুলো একসাথে ঘোরাঘুরি করছে / সরবর করে

ম্যালেরিয়ার মশক → ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায় যে মশা

বিষ গুলিছে জলে → জলে বিষ ছড়াচ্ছে / মশা ডিম পাড়ছে

পিলে → প্লীহা (পেটের একটি অঙ্গ), যার অসুখে পেট ফুলে ওঠে

নিতুই → নিত্য / প্রতিদিন / রোজ

বৈদ্য → কবিরাজ / গ্রাম্য ডাক্তার

মমতাময় → স্নেহমাখা / মায়ায় ভরা

নান্দনিক → সুন্দর / শিল্পমাধুর্যপূর্ণ

সহানুভূতি → অন্যের দুঃখে মমতা / সমব্যথী হওয়া

সামাজিক দায়বোধ → সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধ

আসমানি কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

কবিতা থেকে জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ১: ‘আসমানি’ কবিতার কবি কে?
উত্তর: জসীমউদ্দীন।

প্রশ্ন ২: আসমানিকে দেখতে কোথায় যেতে হবে?
উত্তর: রসুলপুরের রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়িতে।

প্রশ্ন ৩: রহিমদ্দির বাড়ি কীরকম?
উত্তর: পাখির বাসার মতো।

প্রশ্ন ৪: বাড়ির ছাউনি কী দিয়ে তৈরি?
উত্তর: ভেন্না পাতা দিয়ে।

প্রশ্ন ৫: একটু বৃষ্টি হলে কী হয়?
উত্তর: পানি গড়িয়ে পড়ে।

প্রশ্ন ৬: হাওয়া দিলে কী হয়?
উত্তর: ঘর নড়বড় করে।

প্রশ্ন ৭: আসমানির খাওয়া-দাওয়া কেমন?
উত্তর: পেট ভরে খায় না।

প্রশ্ন ৮: বুকের কী বেরিয়ে আছে?
উত্তর: ক’খান হাড়।

প্রশ্ন ৯: অনাহারে কদিন গেছে বলে কে সাক্ষী দিয়েছে?
উত্তর: তার রোগা শরীর।

প্রশ্ন ১০: হাসির প্রদীপ-রাশি কী করে নিভিয়ে দিয়েছে?
উত্তর: দারুণ অভাবে।

প্রশ্ন ১১: পরনে কী পরে আসমানি?
উত্তর: শতেক তালির ছেঁড়া বাস (পোশাক)।

প্রশ্ন ১২: সোনালি গার বরণের সঙ্গে কী তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: উপহাস।

প্রশ্ন ১৩: আসমানির চোখের রং কেমন?
উত্তর: ভোমর-কালো।

প্রশ্ন ১৪: তার চোখ দিয়ে কী পড়ে?
উত্তর: অশ্রু রাশি রাশি।

প্রশ্ন ১৫: তার গলার সুর কেমন ছিল?
উত্তর: বাঁশির মতো।

প্রশ্ন ১৬: গলার সুর কেন ক্ষয়ে গেছে?
উত্তর: কান্নার কারণে।

প্রশ্ন ১৭: আসমানিদের বাড়ির ধারে কী আছে?
উত্তর: পদ্ম-পুকুর।

প্রশ্ন ১৮: পদ্ম-পুকুরে কাদের ছানা থাকে?
উত্তর: ব্যাঙের ছানা।

প্রশ্ন ১৯: পুকুরের জলে কী ছড়ায়?
উত্তর: ম্যালেরিয়ার মশা বিষ ছড়ায়।

প্রশ্ন ২০: পুকুরের পানি দিয়ে আসমানিদের কী চলে?
উত্তর: রান্না-খাওয়া।

প্রশ্ন ২১: আসমানির পেট কেন ফুলছে?
উত্তর: পিলে রোগের কারণে।

প্রশ্ন ২২: প্রতিদিন আসমানির কী হয় তার?
উত্তর: জ্বর হয়।

প্রশ্ন ২৩: বৈদ্য ডাকলেও কী হয় না?
উত্তর: ওষুধ কেনার পয়সা নেই।

প্রশ্ন ২৪: ‘আসমানি’ কবিতার মূল বক্তব্য কী?
উত্তর: গরিব শিশুদের দারিদ্র্য ও দুঃখের করুণ চিত্র।

শব্দার্থ ও পাঠ পরিচিতি থেকে জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ২৫: ‘ভেন্না পাতা’ কী?
উত্তর: ভেন্না এক ধরনের গাছ, যার পাতা গরিব লোকেরা ঘরের ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করে।

প্রশ্ন ২৬: ‘অনাহারে’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: আহার বা খাবার ছাড়া, না খেয়ে বা অভুক্ত থাকা।

প্রশ্ন ২৭: ‘হাসির প্রদীপ রাশি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: হাসি মুখমণ্ডলকে প্রদীপের আলোর মতো উজ্জ্বল করে।

প্রশ্ন ২৮: ‘বাস’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: বাস অর্থ পোশাক।

প্রশ্ন ২৯: ‘উপহাস’ ও ‘মশক’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: উপহাস অর্থ ঠাট্টা ও মশক অর্থ মশা।

প্রশ্ন ৩০: ‘পিলে’ কী?
উত্তর: প্লীহা (Spleen); এ অসুখে পেট ফুলে ওঠে।

প্রশ্ন ৩১: ‘নিতুই’ ও ‘বৈদ্য’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: নিতুই অর্থ নিত্য বা প্রতিদিন ও বৈদ্য অর্থ কবিরাজ।

প্রশ্ন ৩২: ‘আসমানি’ কবিতায় কী ধরনের প্রকাশ ঘটেছে?
উত্তর: সাধারণ মানুষের প্রতি, বিশেষত গ্রামের শিশুদের দুঃখ-কষ্টময় জীবনের প্রতি মমতাময় অনুভূতির নান্দনিক প্রকাশ।

প্রশ্ন ৩৩: আসমানিদের বাসা কেমন?
উত্তর: পাখির বাসার মতো হালকা।

প্রশ্ন ৩৪: একটু বৃষ্টিতে তাদের বাসার কী হয়?
উত্তর: নড়বড় করে।

প্রশ্ন ৩৫: তারা কেন অসুখে ভোগে?
উত্তর: ঠিক মতো খেতে পায় না বলে।

প্রশ্ন ৩৬: আসমানির পোশাক কেমন?
উত্তর: ছেঁড়া।

প্রশ্ন ৩৭: আসমানির মুখে ও কণ্ঠে কী নেই?
উত্তর: মুখে হাসি নেই, কণ্ঠে গান নেই।

প্রশ্ন ৩৮: আসমানির জীবনের চিত্র কী জাগিয়ে তোলে?
উত্তর: সহানুভূতি ও সামাজিক দায়বোধ।

কবি পরিচিতি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ৩৯: কবি জসীমউদ্দীনের জন্ম কত খ্রিষ্টাব্দে?
উত্তর: ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে।

প্রশ্ন ৪০: তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে।

প্রশ্ন ৪১: তিনি কোন কলেজে পড়ার সময় ‘কবর’ কবিতা লিখেন?
উত্তর: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন।

প্রশ্ন ৪২: ‘কবর’ কবিতা কোন শ্রেণির বাংলা সংকলনে স্থান পায়?
উত্তর: প্রবেশিকা শ্রেণির।

প্রশ্ন ৪৩: জসীমউদ্দীনের কবিতায় কী কী ফুটে উঠেছে?
উত্তর: গ্রামবাংলার জীবন ও প্রকৃতির ছবি।

প্রশ্ন ৪৪: ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কোন ধরনের গ্রন্থ?
উত্তর: কাব্যগ্রন্থ।

প্রশ্ন ৪৫: ‘রাখালী’ ও ‘বালুচর’ কার রচনা?
উত্তর: জসীমউদ্দীনের।

প্রশ্ন ৪৬: ‘ধানখেত’ ও ‘সুচয়নী’ কী ধরনের গ্রন্থ?
উত্তর: কাব্যগ্রন্থ।

প্রশ্ন ৪৭: শিশুদের জন্য রচিত তাঁর অনবদ্য গ্রন্থের নাম কী?
উত্তর: ‘ডালিম কুমার’।

প্রশ্ন ৪৮: তাঁর কর্মজীবন কীভাবে শুরু হয়?
উত্তর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে।

প্রশ্ন ৪৯: পরে তিনি দীর্ঘদিন কোন বিভাগে কাজ করেন?
উত্তর: সরকারের প্রচার বিভাগে।

প্রশ্ন ৫০: জসীমউদ্দীনের মৃত্যু কত খ্রিষ্টাব্দে?
উত্তর: ১৯৭৬ সালে।

প্রশ্ন ৫১: তিনি কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: ঢাকায়।

Leave a Comment