বোশেখ কবিতার মূলভাব, শব্দার্থ ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

বোশেখ কবিতার মূলভাব

মূলভাবঃ ‘বোশেখ’ কবিতায় কবি আল মাহমুদ বৈশাখের ঝড়ের ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক রূপ তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি এই ঝড়ে গরিব ও অসহায় মানুষের কষ্টের কথাও বলেছেন। বৈশাখের প্রচণ্ড বাতাস বুনোহাঁসের ঝাঁক ছড়িয়ে দেয়, জেট বিমান পর্যন্ত দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে, নদীর পানি আকাশে তুলে দেয় এবং টেলিগ্রাফের খুঁটি ভেঙে ফেলে। কবি সেই ঝড়কে অনুরোধ করে বলেন, গরিব মাঝির নৌকার পালের দড়ি ছিঁড়ে দিয়ে তোমার কী লাভ? গরিব চাষির ঘর ভেঙে, টুনটুনির ছোট বাসা নষ্ট করে এবং দুঃখী মায়ের ভাতের হাঁড়ি উল্টে দিয়ে তুমি কী আনন্দ পাও? কবি ঝড়কে প্রশ্ন করেন, তুমি কি রামায়ণের মহাবীর হনুমানের বাবা? নাকি কালিদাসের মেঘদূতের সেই দয়ালু মেঘ? যদি তাই হও, তাহলে তুমি এত নিষ্ঠুর ও নির্দয় কেন? তুমি গরিব চাষির ঘর উড়িয়ে দাও, অথচ যারা মানুষকে ঠকিয়ে বড় বড় প্রাসাদ তৈরি করেছে, তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারো না। কবি মনে করিয়ে দেন, তুমি তো রাজা সোলেমানের বাহন, যার তলোয়ার অত্যাচারীদের শাস্তি দিত। রবীন্দ্রনাথও তোমার কাছে পুরোনো ও মরা জিনিস সরিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা করেছিলেন। তাই কবি বলেন, যদি ধ্বংস করতেই হয়, তবে সমাজের বিভেদ সৃষ্টি করে যারা পরগাছার মতো বেঁচে থাকে, তাদের ধ্বংস করো। যারা অন্যের শ্রমের ওপর ভর করে বড় বড় দালান তৈরি করে, তাদের অহংকারও গুঁড়িয়ে দাও। এভাবেই কবি বৈশাখের ঝড়কে গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

বোশেখ কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

বোশেখ – বৈশাখ মাস / বাংলা বছরের প্রথম মাস

বুনোহাঁস – বনে থাকে এমন হাঁস / গৃহপালিত নয়

জেটের পাখা – জেট বিমানের ডানা

দুমড়ে – বেঁকে যায় / মোচড় দিয়ে ভেঙে যায়

আছাড় মারে – আছাড় খায় / ধাক্কা খায় / ভেঙে পড়ে

টেলিগ্রাফ – খবর পাঠানোর পুরোনো যন্ত্র / তারের মাধ্যমে খবর পাঠানোর মাধ্যম

তিষ্ঠ – থাম / স্থির হও / দাঁড়া

মহাপ্রতাপশালী – খুব পরাক্রমশালী / খুব শক্তিশালী

পালের দড়ি – নৌকার পাল বাঁধার দড়ি

গুঁড়িয়ে দিয়ে – একেবারে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে

চাষির ভিটে – চাষির ঘরবাড়ির জায়গা

বেগুন পাতার বাসা – বেগুন গাছের পাতায় বাসা

টুনটুনি – ছোট্ট একটি পাখি

উল্টে ফেলে – ওলটপালট করে দেয় / উপুড় করে দেয়

দুঃখী মায়ের ভাতের হাঁড়ি – গরিব মায়ের রান্নার হাঁড়ি

দেবতা – দেবতা / ঈশ্বর

বাবুই পাখির ঘর – বাবুই পাখির বোনা বাসা

রামায়ণ – বাল্মীকি রচিত একটি মহাকাব্য

কীর্তিগাথা – বীরত্বের গল্প / কীর্তির কথা

মহাবীর হনুমান – রামায়ণের বীর দেবতা হনুমান

কালিদাসের মেঘদূত – কালিদাসের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মেঘদূতম

দয়ালু মেঘের সাথী – দয়ালু মেঘের সঙ্গী

নিঠুর – নিষ্ঠুর / নির্দয় / কঠোর

লোক ঠকিয়ে – মানুষকে ঠকিয়ে / প্রতারণা করে

প্রাসাদ – রাজবাড়ি / বড় বিলাসবহুল দালান

ইট খসাতে – ইট খসিয়ে ফেলা / ইট নড়াতে

সুবিচার – ভালো বিচার / ন্যায়বিচার

বাহন – যানবাহন / পশু-পাখি যার ওপর চড়ে বেড়ান

রাজা সোলেমান – হজরত সুলায়মান (আ.) / বীর ও ন্যায়পরায়ণ শাসক

অত্যাচারী – যারা অন্যের ওপর জুলুম করে

অহমিকা – অহংকার / গর্ব / আমি-আমি ভাব

অট্টালিকা – বড় ভবন / প্রাসাদ

গুঁড়িয়ে দিতো – ভেঙে ফেলত

কবির রাজা রবীন্দ্রনাথ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

করজোড়ে – হাত জোড় করে / বিনীতভাবে / প্রার্থনা করে

পুরানো শুষ্ক মরা – যেসব বিষয় পুরনো, শুষ্ক ও মৃতপ্রায়

অদরকারি – প্রয়োজন নেই এমন / দরকার নেই

কালবোশেখ – বৈশাখ মাসের কালো ঝড়

ফুঁয়ে – একটি ফুঁ দিয়েই / এক নিঃশ্বাসেই

তুফান – ঝড় / ঘূর্ণিঝড়

বিভেদকারী – যারা বিভেদ সৃষ্টি করে / ভেদাভেদ তৈরি করে

পরগাছা – পরগাছা (এক ধরনের গাছ) / এখানে যারা অন্যের ঘাড়ে ইনকা করে বড় হয়, তাদের বোঝানো হয়েছে

পরের শ্রম – অন্যের পরিশ্রম

মস্ত দালান – বড় ভবন / প্রকাণ্ড অট্টালিকা

বাড়তি বাহাদুরি – অহেতুক বাহাদুরী / উপরে ওঠার আড়ম্বর

বোশেখ কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন ১: ‘বোশেখ’ কবিতার কবি কে?
উত্তর: আল মাহমুদ।

প্রশ্ন ২: কোন বাতাসে বুনোহাঁসের ঝাঁক ভেঙে যায়?
উত্তর: বোশেখের বাতাসে।

প্রশ্ন ৩: বোশেখের বাতাসে জেটের পাখার কি হয়?
উত্তর: দুমড়ে শেষে আছাড় মারে।

প্রশ্ন ৪: বোশেখের বাতাসে নদীর পানি কী করে?
উত্তর: শূন্যে তুলে দেয় ছড়িয়ে।

প্রশ্ন ৫: টেলিগ্রাফের থামগুলোকে কী করে?
উত্তর: নুইয়ে দেয়।

প্রশ্ন ৬: কবি সেই পবনের কাছে কী চান?
উত্তর: মিনতি করেন তিষ্ঠ হও।

প্রশ্ন ৭: বোশেখের বাতাসে গরিব মাঝির কী ছিঁড়ে?
উত্তর: পালের দড়ি।

প্রশ্ন ৮: চাষির কী গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়?
উত্তর: ভিটে।

প্রশ্ন ৯: টুনটুনিদের কী ছিঁড়ে দেওয়া হয়?
উত্তর: বেগুন পাতার বাসা।

প্রশ্ন ১০: দুঃখী মায়ের কী উল্টে ফেলা হয়?
উত্তর: ভাতের হাঁড়ি।

প্রশ্ন ১১: কবি দেবতাকে কী প্রশ্ন করেন?
উত্তর: কী আনন্দ, কী মজা পাও।

প্রশ্ন ১২: বাবুই পাখির কী উড়িয়ে দেওয়া হয়?
উত্তর: ঘর।

প্রশ্ন ১৩: রামায়ণে যার কীর্তিগাথা পড়েছেন, তিনি কে?
উত্তর: মহাবীর হনুমান।

প্রশ্ন ১৪: কালিদাসের মেঘদূতে কার কথা আছে?
উত্তর: দয়ালু মেঘের।

প্রশ্ন ১৫: বোশেখের বাতাসে গরিব চাষির কী উড়িয়ে নিল?
উত্তর: ঘরের খুঁটি।

প্রশ্ন ১৬: যারা লোক ঠকিয়ে প্রাসাদ গড়ে, তাদের কী খসাতে পারলে না?
উত্তর: কোন ইট।

প্রশ্ন ১৭: বাতাস কার বাহন ছিল?
উত্তর: রাজা সোলেমানের।

প্রশ্ন ১৮: রাজা সোলেমানের তলোয়ার কী করত?
উত্তর: অত্যাচারীর মাথা কাটত।

প্রশ্ন ১৯: অহমিকার কী গুঁড়িয়ে দিতো সোলেমানের তলোয়ার?
উত্তর: অট্টালিকা।

প্রশ্ন ২০: কবিদের এক মহান রাজা কে?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ।

প্রশ্ন ২১: রবীন্দ্রনাথ কীভাবে দাঁড়িয়েছিলেন?
উত্তর: করজোড়ে (হাত জোড় করে)।

প্রশ্ন ২২: রবীন্দ্রনাথ কী উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন?
উত্তর: পুরানো, শুষ্ক, মরা, অদরকারি জিনিস।

প্রশ্ন ২৩: কবি তুফানকে কী করতে বলেছেন?
উত্তর: ধ্বংস করো বিভেদকারী পরগাছাদের।

প্রশ্ন ২৪: পরের শ্রমে কারা মস্ত দালান গড়ে?
উত্তর: বিভেদকারীরা।

প্রশ্ন ২৫: বিভেদকারীদের কী গুঁড়িয়ে ফেলতে বলেছেন কবি?
উত্তর: বাড়তি বাহাদুরি।

প্রশ্ন ২৬: ‘পরগাছা’ বলতে এখানে কাদের বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: যারা পরের শ্রমে বড় হয়।

প্রশ্ন ২৭: বোশেখ কবিতায় কোন মাসের বাতাসের বর্ণনা আছে?
উত্তর: বৈশাখ মাসের।

প্রশ্ন ২৮: ‘বুনোহাঁস’ কাদের বলা হয়?
উত্তর: যেসব হাঁস গৃহপালিত নয়, বনে থাকে।

প্রশ্ন ২৯: ‘জেট’ কী?
উত্তর: দ্রুতগতিসম্পন্ন উড়োজাহাজ।

প্রশ্ন ৩০: ‘টেলিগ্রাফ’ কী?
উত্তর: সংকেতের সাহায্যে দূরে বক্তব্য প্রেরণের যন্ত্র।

প্রশ্ন ৩১: ‘তিষ্ঠ’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: স্থির হও।

প্রশ্ন ৩২: ‘রামায়ণ’ কী?
উত্তর: পৃথিবীর চারটি জাত মহাকাব্যের একটি, রচয়িতা বাল্মীকি।

প্রশ্ন ৩৩: ‘মহাবীর হনুমান’ কে?
উত্তর: রামায়ণের বীর ও রামভক্ত দেবতা হনুমান।

প্রশ্ন ৩৪: ‘কালিদাসের মেঘদূত’ কী?
উত্তর: কালিদাস রচিত সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘদূতম্’।

প্রশ্ন ৩৫: ‘রাজা সোলেমান’ কে ছিলেন?
উত্তর: ডেভিডের পুত্র ও ইসরাইলের তৃতীয় রাজা, বীর ও দক্ষ যোদ্ধা।

প্রশ্ন ৩৬: ‘অদরকারি’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: যার প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন ৩৭: ‘বোশেখ’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত?
উত্তর: ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কাব্য থেকে।

প্রশ্ন ৩৮: বৈশাখ মাসকে কবি কীভাবে বর্ণনা করেছেন?
উত্তর: পরাক্রমশালী, রুদ্র সংহারক রূপে।

প্রশ্ন ৩৯: বৈশাখের শিকার কারা হয়?
উত্তর: দুঃখী দরিদ্র মানুষ ও অসহায় প্রাণী।

প্রশ্ন ৪০: ধনীদের প্রাসাদের কী হয় না?
উত্তর: কোনো ক্ষতি হয় না।

প্রশ্ন ৪১: কবি কীসের প্রতি আক্ষেপ করেছেন?
উত্তর: প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা কেন শুধু গরিবের বিরুদ্ধে ঘটে।

প্রশ্ন ৪২: কবি বৈশাখের কাছে কী কামনা করেছেন?
উত্তর: যেসব অট্টালিকা শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ করে গড়ে উঠেছে, সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া।

প্রশ্ন ৪৩: আল মাহমুদের জন্ম কত খ্রিষ্টাব্দে?
উত্তর: ১৯৩৬ সালে।

প্রশ্ন ৪৪: তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে।

প্রশ্ন ৪৫: আল মাহমুদের প্রকৃত নাম কী?
উত্তর: মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ।

প্রশ্ন ৪৬: তিনি দীর্ঘকাল কী পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন?
উত্তর: সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে।

প্রশ্ন ৪৭: কোন পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন?
উত্তর: পরিচালকের পদ থেকে।

প্রশ্ন ৪৮: কোন ঘটনা আল মাহমুদকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে?
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধ।

প্রশ্ন ৪৯: স্বাধীনতার পর তিনি কোন পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন?
উত্তর: ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকার।

প্রশ্ন ৫০: ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালি কাবিন’ কী ধরনের গ্রন্থ?
উত্তর: কাব্যগ্রন্থ।

প্রশ্ন ৫১: ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কী ধরনের গ্রন্থ?
উত্তর: শিশুতোষ কবিতার বই।

প্রশ্ন ৫২: আল মাহমুদের মৃত্যু কত খ্রিষ্টাব্দের কত তারিখে?
উত্তর: ২০১৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি।

Leave a Comment